বুধবার, জানুয়ারি ২৭, ২০২১

মমতায় মোহাচ্ছন্ন হয়ে শিশুর বিকাশ রোধ নয়

ভাষান্তর: | বাংলা বাংলা English English हिन्दी हिन्दी

নুসরাত আমিনঃ দেশে চাকরির বিজ্ঞাপনগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, চাকরি প্রাপ্তির শর্তগুলোর মধ্যে প্রধান স্থান দখল করে আছে সংশ্লিষ্ট চাকরির জন্য প্রার্থীর পর্যাপ্ত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার বিষয়। যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহ দরকার, কিন্তু চাকরির জন্য ব্যক্তির দায়িত্ববোধের বিষয়টি উপেক্ষিত হয়। প্রার্থীদের কতটা দায়িত্ববোধ আছে, তা বোঝার কোনো চেষ্টা লক্ষ করা যায় না। এর কারণ হচ্ছে, চাকরির সঙ্গে দায়িত্ববোধের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট করে দেখা হয় না। যাঁরা বিজ্ঞপ্তি দেন বা সাক্ষাৎকার নেন, তাঁরা এভাবে ভাবতে অভ্যস্ত নন। এটা তাঁদের দোষ নয়। গোটা শিক্ষাব্যবস্থাই এর জন্য দায়ী।

বাংলাদেশিদের এক বিরাটসংখ্যক মানুষের চেতনায় দায়িত্ববোধ গুরুত্ব পায় বলে মনে হয় না, দেখাও যায় না। তাই সময়ের কাজ সময়ে হয় না। অফিসের ফাইলে লাল ফিতার গিঁট পড়ে। গ্যাস-বিদ্যুতে অবিশ্বাস্য সিস্টেম লস, নিম্ন থেকে সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে শিক্ষকের গরহাজিরা, সেশনজট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, পণ্যে ভেজাল, অবৈধ অর্জনে প্রতিযোগিতা, বিচারে লেনদেনের অভিযোগ, রাজপথে পশুত্বের মহড়া, আগুন-ভাঙচুর, তারুণ্যের অপচয়, অগণতান্ত্রিকতা—এ সবই ব্যক্তির চেতনায় দায়িত্বজ্ঞানের অভাব থেকে তৈরি।

কেন এমন হয়? এর কারণ হলো, মন-মানসিকতা-চেতনায় দায়িত্ববোধের বিষয় গুরুত্ব পায় বা শক্তিশালীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, এমন লেখা আমরা ছোট থেকেই পাঠ বা নাটক-সিনেমায় দেখার সুযোগ পাই না। ফলে আমাদের মধ্যে দায়িত্ববোধ নামক বৃক্ষটি গভীরে শিকড় গাড়ে না। স্কুল-কলেজের রচনায় অথবা পৌরবিজ্ঞানের কিছু কিছু অধ্যায়ে দায়িত্ব শব্দটির ব্যবহার দেখা যায়। এসব অধ্যায় ভালোভাবে মুখস্থ করে পরীক্ষার খাতায় লিখতে পারলেই হলো। বইয়ের পাতা থেকে এ শব্দটি মানবজীবনে অর্থবহ হয়ে ওঠে না। এ ছাড়া পারিবারিক, সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় জীবনে শব্দটিও উচ্চারিত হয় না।

জাতির ধর্ম, বর্ণ, কৃষ্টি-সংস্কৃতি, আচার-অনুষ্ঠান ও বিশ্বাসের প্রতি দৃষ্টি রেখে জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থা কেমন হবে, তার একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। নীতিমালায় উল্লিখিত বিষয়গুলোর যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হলেও দায়িত্ব বা দায়িত্ব পালনের বিষয়টি আলোচিত হয় না। এর ফলে প্রচলিত শিক্ষানীতির মাধ্যমে দায়িত্ব শব্দটির সঙ্গে শিক্ষার্থীর কোনো সম্পর্ক গড়ে ওঠে না। আরও একটি কারণ হলো, কোনো শিক্ষার্থীই তার শিক্ষক বা অভিভাবকের ব্যবহারিক জীবন দর্শন বা শ্রবণ করে দায়িত্ব পালনের বাস্তব ধারণা অর্জন করতে পারে না। অর্থাৎ অভিভাবক নিজে সারা দিন যে কাজগুলো করলেন, তা দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্যে করলেন—কথাটা শিশুকে কখনোই বলা হয় না, বোঝানো হয় না।

এটাও কম বলা হয় যে অভিভাবকের মতো শিশুটিকেও তার উপযোগী দায়িত্ব পালন করতে হবে। শিক্ষকও শিক্ষার্থীর প্রতি তার দায়িত্ব পালনের ব্যাখ্যা প্রদান করেন না অথবা শিক্ষার্থীর দায়িত্বই-বা কী, তা-ও ব্যাখ্যা করা হয় না। অভিভাবক বা শিক্ষক শুধু বলেন পড়ো পড়ো। এতে অধিকাংশ শিশুই লেখাপড়াকে নিজ দায়িত্ব হিসেবে গুরুত্ব না দিয়ে ঝামেলাপূর্ণ কাজ বলে মনে করে। লেখাপড়ার পাশাপাশি নিয়মিত শরীরচর্চা, খেলাধুলা, আহার-নিদ্রা, পরিচ্ছন্নতা—এসব করাও যে একজন শিশুর দায়িত্ব, শিশু তা বোঝার সুযোগ পায় না। এর ফলে প্রতিদিনের জীবনে তার কোনো প্রতিফলন হয় না; দায়িত্ব পালনের মনোভাব গড়ে ওঠে না।

শিশুকে দায়িত্ববান হিসেবে গড়ে তোলার প্রথম শর্ত হচ্ছে, শিশুর চারপাশে যাঁরা আছেন, তাঁদের বিশ্বাস করতে হবে যে মানবজাতি দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্যেই পৃথিবীতে এসেছে। তাই সে প্রকৃতিগতভাবে জন্মলগ্ন থেকে দায়িত্ব পালন শুরু করে। শিশুকে দায়িত্ববান হিসেবে গড়ে তোলার প্রথম শর্ত হচ্ছে, শিশুর চারপাশে যাঁরা আছেন, তাঁদের বিশ্বাস করতে হবে যে মানবজাতি দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্যেই পৃথিবীতে এসেছে। তাই সে প্রকৃতিগতভাবে জন্মলগ্ন থেকে দায়িত্ব পালন শুরু করে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একটি শিশু তার জন্মের শুরু থেকেই প্রকৃতিগতভাবে তার বিকাশের প্রতিটি পর্যায় প্রায় এককভাবেই পালন করে। সেটি জন্মকালে কান্না থেকে তার বিকাশের বিভিন্ন পর্যায়ে আমরা দেখতে পাই। তার ভেতরে আত্মবিশ্বাসের প্রকাশ দেখতে পাই যখন সে নিজ পায়ে দাঁড়ায়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে যখন সে আরও কঠিন দায়িত্ব পালনে অগ্রসর হয়, তখন আমরা অনেক সময়ে তাদের সাহায্য করার নামে অনেক কিছুই করি, যা তাদের মধ্যে দায়িত্বসচেতনতা, দায়িত্ববোধ গড়ে তোলায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে।

অনেক ক্ষেত্রেই তা করা হয় ভালোবাসা ও মমতায় মোহাচ্ছন্ন হয়ে। এতে করে দায়িত্ব পালনে অগ্রসরমাণ একজন শিশুর গতিরোধ করে দিই। ফলে শিশু তার কিশোর যুব বা পূর্ণাঙ্গ জীবনের সব ধাপেই দায়িত্ব পালনে এবং আত্মবিশ্বাস অর্জনে ব্যর্থ হয়। অথচ আমাদের উচিত ছিল বাধা না দিয়ে ওই কাজগুলো সুনিপুণভাবে সম্পন্ন করার কৌশল দেখিয়ে দেওয়া। পাশাপাশি স্বীকৃতি দেওয়া, স্মরণ করিয়ে দেওয়া যে এগুলো দায়িত্ব হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, নিজের দায়িত্ব যে নিজে পালন করতে পারে পরবর্তী সময়ে পারিবারিক, সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় দায়িত্বও সে পালন করতে পারবে।

দায়িত্ব পালনে পারদর্শী হতে হলে অবশ্যই অনুশীলনের প্রয়োজন। অনুশীলনের বিভিন্ন দিক আছে। এমনকি নিয়মিতভাবে সকালে ঘুম থেকে ওঠাও তার একটি উদাহরণ। নিয়মিতভাবে পরিচ্ছন্নতায় উৎসাহী করা, গুরুত্বের সঙ্গে তা পর্যবেক্ষণ করা তাদের ভেতরে দায়িত্ববোধ তৈরি করবে, সেই সব কাজ তারা নিজেই করবে। দায়িত্ব পালনে সচেতন শিশুকে অনুশীলনে সহযোগিতা করতে হবে। পাশাপাশি প্রাসঙ্গিক হলে দায়িত্ব শব্দটি উল্লেখ করতে হবে। একটি মানুষকে বেঁচে থাকার জন্য দৈনন্দিন জীবনে যা কাজ প্রয়োজন, তা একজন শিশুর জানা প্রয়োজন। এগুলো জীবনধারণের নির্ভরশীলতা তৈরি করে এবং এই আত্মনির্ভরতা বাঞ্ছনীয়। এগুলোকে দায়িত্ব হিসেবে চেতনায় স্থান দিতে হবে।

তাই শিশুর মানস গঠন করার কাজে সহায়ক ব্যক্তিদের উচিত দায়িত্ব শব্দটির গভীরতা শিশুর চিন্তা-চেতনায় প্রোথিত করা এবং পাঠ্যবইয়ে জীবন গঠনের বিষয়গুলো শুধু পরীক্ষার জন্য মুখস্থ করানো নয়, নিজের জীবনে দায়িত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে যত্নবান হওয়া। পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবনের সব কাজই যেন শিশু নিজে করে আত্মনির্ভর হয়, সে দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা। তাহলেই শিশুর চেতনায় দায়িত্বজ্ঞানের উন্মেষ ঘটবে এবং পরবর্তী প্রজন্ম দায়িত্ববান হতে সক্ষম হবে। এই মুহূর্তে জাতির সংকট নিরসনে এর প্রয়োজন খুব বেশি।

শেয়ার করুন: